Student Society স্বাধীন ভারতে ছাত্রসমাজ

0
62
Student Society

Student Society স্বাধীন ভারতে ছাত্রসমাজ


স্বাধীন ভারতে ছাত্রসমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য (অনুচ্ছেদ)

জাতীয় ও সামাজিক জীবনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । দেশের অগণিত জনসাধারণের মধ্যে ছাত্রসমাজ চিন্তা , চেতনা এবং শিক্ষায় এক অগ্রগামী বাহিনী , জাগ্রত সৈনিক , ভবিষ্যতের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা । ইতিহাস , অর্থনীতি , রাজনীতি , সাহিত্য – সংস্কৃতিতে শিক্ষালাভ যেমন , তেমনি দেশ ও জাতির অবস্থা সচেতনভাবে উপলব্ধি করাও তাদের কর্তব্য । তাদের শিক্ষার জন্য পিতামাতা যেমন অর্থব্যয় করেন , তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তা করেন , তেমনি দেশও ভবিষ্যতে সমাজের এক – একজন দায়িত্বশীল সচেতন নাগরিক হয়ে গড়ে উঠতে তাদের সাহায্য করে ।

Student Society

ছাত্রদের কাছে অধ্যায়নই তপস্যা , এ কথা ঠিক । কিন্তু অধ্যায়নের পরিবেশ যদি অনুকূল না থাকে , তা হলে তাকে অনুকূল করে তুলবার কিছুটা দায়িত্বও পরোক্ষভাবে ছাত্রদের । তাছাড়া অধ্যায়নেরও লক্ষ্য থাকে । অধ্যায়নের ফলে ছাত্ররা যেমন কোন বিষয়কে জানতে পারে , তেমনি সেই জানাকে যদি তারা জীবনে যথাযথ প্রয়োগ করতে না পারে , তা হলে সেই জানা হয়ে পড়ে অর্থহীন । ছাত্ররা এক বিরাট জনগোষ্ঠীর সার্থক প্রতিনিধি । তাই অধ্যয়ন ছাত্রদের লক্ষ্য হলেও , সঙ্গে সঙ্গে দেশের ও সমাজের সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কেও তাদের সচেতন থাকতে হবে ।

ছাত্রসমাজকে উপলব্ধি করতে হবে যে , তারাই এই দেশের ভবিষ্যৎ পরিচালক । দেশের ভবিষ্যৎ উন্নতি এবং অবনতি অনেকাংশে তাদের শিক্ষা ও ক্রিয়াকলাপের উপর নির্ভরশীল । তারা যদি সচেতন নাগরিক হিসাবে নিজেদের উপযুক্ত করে তুলতে পারে , তা হলে তারা দেশের নানা অন্যায় অবিচার প্রতিরোধ করতে পারবে । দেশের ও সমাজের প্রতি তাদের গভীর মমত্ববোধ অনেক সমস্যাকে দূর করতে পারবে । সেজন্য ছাত্রসমাজের প্রথম প্রয়োজন হল দেশকে ভালবাসা ।

ছাত্রসমাজকে সচেতন নাগরিক হিসাবে , আদর্শপরায়ণ মানুষ হিসাবে নিজ নিজ চরিত্র গঠন করতে হলে তাদের সামনে যে বহু লোভ এবং বিকৃতির প্রলোভন আসে তাদের জয় করতে হবে । তাদের দেশ – বিদেশের সমাজ , রীতিনীতি , বিজ্ঞান চেতনার সঙ্গে পরিচিত হতে হবে । কারণ শিক্ষিত এবং সচেতন মানুষই পারে সঠিক নেতৃত্ব দিতে , ভবিষ্যৎ পথের পথনির্দেশ করতে ।

also Read Olympic অলিম্পিক গেমস 2026

ছাত্রসমাজকে দেশের সর্বাঙ্গীণ অবস্থা সচেতন হতে হবে । দেশকে নিজের মায়ের মত ভালবাসতে হবে । মানুষকে নিয়েই দেশ । দেশের নিরক্ষরতা দূরীকরণের কাজে তাদেরও সক্রিয় ভূমিকা থাকবে । জাতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে জনসাধারণের মধ্যে তার আদর্শ প্রচার করলে মানুষ ক্ষুদ্র দলাদলি ও ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে পরস্পর নিবিড় ঐক্যবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে ।

স্বাধীন ভারতবর্ষে আজ নানা সমস্যা । সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা , খুনোখুনি , পারস্পরিক বিদ্বেষ , বিচ্ছিন্নতা আমাদের জাতীয় সংহতি এবং সাংস্কৃতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে । ছাত্র সমাজকে জাগ্রত প্রহরী ন্যায় এই দিকে নজর রাখতে হবে । তাদের যথোচিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের দ্বারাই ভারতের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে । নেতাজী সুভাষচন্দ্র ছাত্রসমাজের প্রতি লক্ষ্য রেখে বলেছিলেন যে , ছাত্ররা পৃথিবীতে নতুন বন্যা ডেকে আনে , যেখানে যত অন্যায় তার বিরুদ্ধে তারা কুঠার হস্তে উপস্থিত হয় – ছাত্রদের যৌবনশক্তির উদ্ধৃত আবেগে সমস্ত প্রকার অন্যায় , অসত্য , অত্যাচার , পাপ চূর্ণ – বিচূর্ণ হয়ে কোথায় উড়ে চলে যায় । নিজেদের আচরণ ও চরিত্র দিয়েই ছাত্রসমাজকে এই বক্তব্যের সারবত্তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে ।

নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও ভারতের ছাত্রসমাজ “ (অনুচ্ছেদ)

আমি কিন্তু সবচেয়ে কম করিয়াই বলিতেছি , কেবলমাত্র লিখিতে পড়িতে শেখা । তাহা কিছু লাভ নহে , তাহা কেবলমাত্র রাস্তা । এই রাস্তাটা না হইলেই মানুষ আপনার কোণে আপনি বদ্ধ হইয়া থাকে । ” — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শিক্ষা হল এমন এক আলো , যে আলোতে মনের আঁধার দূর হয় । সভ্য সমাজ বলতে শিক্ষার আলোকপ্রাপ্ত সামাজিকবৃন্দের সুস্থ সমবায়কে সর্বকালে স্বীকার করা হয় । ভারতবর্ষের ইতিহাস সুপ্রাচীনকাল থেকে শ্রুতি আর স্মৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষার বার্তা বহন করে আসছে । ভারতের মানুষ একদিকে যেমন প্রথাগতভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করে শিক্ষিত সমাজ তৈরী করেছে , অন্যদিকে তেমনি রয়ে গেছে শিক্ষার আলোক বঞ্চিত মানুষ ।

১৯৪৭–২০১১ অর্থাৎ দীর্ঘ ৬৪ বছর আমরা স্বাধীন হয়েছি । অথচ এখনও দেশের অধিকাংশ মানুষ সামান্য নাম সহি , কিছু পঠন এবং নিজের ভাবপ্রকাশের লিখিত প্রকাশ ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত । দেশের শাসক – সম্প্রদায় অনেক পরিকল্পনা , অনেক কমিশন , অনেক বক্তৃতা উপহার দিলেন , কিন্তু সমস্ত নাগরিককে ন্যূনতম শিক্ষার সুযোগ দিতে এখনো পারলো না । এখন আবার নতুন পরিকল্পনার সঙ্গে নতুন শিক্ষা নীতি সম্পর্কে তর্ক – বিতর্ক চলছে । ভারতে এক – তৃতীয়াংশ লোক শিক্ষিত , আর দুই – তৃতীয়াংশ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত । বৃহত্তর অংশের জ্ঞানের আলো বিস্তার করতে না পারলে দেশের সার্বিক অগ্রগতি সম্ভব নয় । কারণ সভ্যতার মূল বৈশিষ্ট্য হল- full – fledged developement in all aspects of the society .

নিরক্ষরতার পরিধি খুব বিচিত্র । প্রথমত , বালক – বালিকাদের সকলকে অক্ষর পরিচয় করানো , দ্বিতীয়ত , বহু বয়স্ক মানুষ , যারা নানাভাবে বিভিন্ন কর্মে নিযুক্ত অথচ নিরক্ষর তাদের প্রয়োজনমুখী শিক্ষাদান এবং তৃতীয়ত , এখনও নানাভাবে উপেক্ষিত , শোষিত নারীসমাজকে উন্নত করা । এর জন্যে প্রয়োজন বিরাট সংগঠন ও প্রচুর নিষ্ঠাবান কর্মী এবং সেই সঙ্গে অর্থের সংকুলন । এখন প্রাথমিক শিক্ষাকে সম্পূর্ণ অবৈতনিক করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে । বর্তমানে গ্রামে ও শহরে রাত্রিকালীন বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে ভারতের সর্বত্র । কৃষক , শ্রমিক ও অন্যান্য পেশায় নিযুক্ত বয়স্ক মানুষের নিমিত্ত পৃথক পাঠ্যসূচী নির্দিষ্ট আছে । প্রথাগতভাবে নয় , বাস্তবজীবনের বহুমুখী প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রেখে এইসব পাঠক্রম স্থির করা হয়েছে ।

মহিলাদের জন্য গ্রামের শিক্ষিতা ও পরিশ্রমী মহিলাদের নিযুক্ত করে শিক্ষাকে জীবনের সর্বস্তরে সঞ্চারিত করার চেষ্টা চলছে । সেই সঙ্গে সরকার প্রতিবছরই শিক্ষাখাতে অর্থের বরাদ্দ বৃদ্ধি করে এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের তালিকায় শিক্ষাকে যুক্ত করেছেন । তাছাড়া , বিভিন্ন সমাজকল্যাণ সংস্থার সাহায্যও গ্রহণ করা হচ্ছে । নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য সার্বিক ও ব্যাপক আন্দোলনের সূচনা হয়েছে । এভাবে অগ্রসর হতে পারলে , আশা করা যায় , ভারতের বুক থেকে নিরক্ষরতার অন্ধকার সম্পূর্ণ দূরীভূত হবে ।

সমাজ কাঠামোর মধ্যে ধনী দরিদ্র্যের বৈষম্য বর্তমানে খুব বেশি । শিক্ষার প্রচার বা প্রসারের পক্ষে এই অবস্থা বিশেষ প্রতিবন্ধকস্বরূপ । উচ্চাসন থেকে বাণী বিতরণ করে নয় , মানুষের জীবনে সত্যকার শরিক হয়ে , তাদের আগ্রহকে উদ্দীপ্ত করে , নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করে তাদের সার্বিক কল্যাণের মূল স্রোতের অঙ্গীভূত করতে হবে । এর জন্য চাই সাক্ষর সমাজের নিঃস্বার্থ সেবার অকুণ্ঠ মনোভাব , প্রয়োজন বিভিন্ন মাধ্যম । তাই সমস্ত গণসংযোগ মাধ্যম , যেমন — রেডিও , টিভি , সিনেমা , পত্র – পত্রিকা , নানাপ্রকার নির্বাচিত অনুষ্ঠানাদির সাহায্যে নিরক্ষর মানুষের কাছে শিক্ষার বাস্তব দিক তুলে ধরতে হবে । আইন করে সকলকে প্রাথমিক স্কুল ও বয়স্ক শিক্ষণকেন্দ্র সমবেত করতে হবে । অল্পবয়স্ক বালক – বালিকাদের গৃহভৃত্য , কলকারখানার শ্রমিক ইত্যাদি রূপে ব্যবহার করা কঠোরভাবে দমন করে , আমাদের দেশকে আবার যথার্থভাবে আধুনিক করে তোলা যায় ।

ছাত্র – ছাত্রীদের কাছে সমাজের অনেক আশা আছে । তারা তাদের অবকাশ মুহূর্তগুলো শিক্ষার বিস্তারে ব্যবহার করতে পারে । প্রতি একজন ছাত্র বা ছাত্রী যদি চারপাশের অশিক্ষিত ও দরিদ্র বালক – বালিকাদের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচজনকে অক্ষরশিক্ষা দিতে পারে , সন্ধ্যায় দু – একদিন বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষকের কাজ করে , তাহলে অল্পসময়ে অনেক জনকে শিক্ষার আলোকে আলোকিত করা যাবে । ছাত্রদের সক্রিয় সহায়তা বিশেষ কাম্য । প্রতিটি ছাত্র সংগঠনের পক্ষেও এই সমস্যা দূরীকরণের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া বিশেষ প্রয়োজন ।

আমাদের সর্বশক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে দেশকে নিরক্ষরতা অভিশাপ থেকে মুক্ত করতেই হবে । তা না হলে দেশের এক বিরাট অংশ নিরক্ষরতার অন্ধকূপে আবদ্ধ থেকে সমগ্র দেশের অগ্রগতিকে ব্যাহত করবে । তাই নিরক্ষরতা সমস্যার সার্বিক উপলব্ধি ও তা দূরীকরণ করা আমাদের আশু লক্ষ্য ও অবশ্য কর্তব্য হওয়া উচিত ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here