Fair and Country Trip একটি গ্রামীণ মেলা ও দেশভ্রমণ

0
43
Fair and Country Trip

Fair and Country Trip একটি গ্রামীণ মেলা ও দেশভ্রমণ (অনুচ্ছেদ)


একটি গ্রামীণ মেলা (অনুচ্ছেদ)

একটি গ্রামীণ মেলা উৎসব জাতীয় জীবনেরই অপরিহার্য অধ্যায় । কমবেশি সকলেরই উৎসবের অভিজ্ঞতা আছে । তবু এমন দু – একটি উৎসবের স্মৃতি মনের মধ্যে এমনভাবে মুদ্রিত হয়ে যায় , যার কথা কিছুতেই ভোলা যায় না । কালিকাপুরের চড়ক উৎসবের কথা আজও আমার কাছে এক অবস্মিরণীয় দুর্লভ অভিজ্ঞতা । কলকাতার কাছেই অখ্যাত গ্রাম । কলকাতা থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে চম্পাহাটি স্টেশন । স্টেশন থেকে বেরিয়ে উত্তরমুখো পথ ধরে বাবাঠাকুরতলা বাঁয়ে রেখে কাঠের সাঁকো পেরিয়ে সোজা দেড় মাইল পথ হেঁটে গেলে পাওয়া যাবে সেই গ্রাম । গাঁয়ে পুরনো একটি কালীমন্দির আছে । আছে চড়কডাঙার মাঠ । চৈত্রমাসের নীল ষষ্ঠীর আগের দিন সন্ন্যাস উপলক্ষে এখানে বসে বিরাট মেলা ।

Fair and Country Trip

চৈত্রের রুক্ষ , তপ্ত হাওয়া ছুটে বেড়ায় । তৃষাদীর্ণ ধূ ধূ প্রান্তর । দীপ্তচক্ষু সন্ন্যাসীর গ্রীষ্মের আসন পাতা হয়েছে সেখানে । চৈত্রের চিতাভস্ম উড়ছে দিক – দিগন্তে । মাদার কৃষ্ণচূড়ার রঙিন রক্তনেশা । পত্রঝোপের আড়ালে , গাছের ডালে দোয়েল – শ্যামার শিস । মাঝে মাঝে কোকিলের মন কাড়া ডাক । রুক্ষ ফুটি ফাটা মাটি ।

সকাল থেকেই ভিড় শুরু হয়েছে । আশপাশের গাঁ থেকে ছেলে বুড়ো জোয়ান , নারী – পুরুষ সব দল বেঁধে আসছে । ঢাকের বাদ্যি বাজছে । প্রতিদিনের অভ্যস্ত জীবনে এসেছে আনন্দের জোয়ার । সন্ন্যাস ব্রতধারী শত শত পুরুষ – নারীর কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে দেবাদিদেব মহাদেবের নাম । সন্ন্যাসীরা ঠাকুর পুকুরে স্নান সারে । কালীমন্দিরের সামনে চলছে সন্ন্যাসীদের গান , চলছে নাচের মহড়া । গাঁয়ের মহিলারা সন্ন্যাসীদের বিতরণ করছেন ফল আর মিষ্টি । খেজুর পাতা দিয়ে ঘেরা হয়েছে ঠাকুরঘর । সেখানে মহাদেবের মূর্তি । সামনে বাঁশের বিরাট ভারা বাঁধা হয়েছে । সন্ন্যাসীরা তার ওপরে উঠে সিঁদুর মাখানো ত্রিশূলের ওপর ঝাঁপ দিচ্ছে ।

চোখে পড়বে চড়ক গাছে ঘুরন্ত সন্ন্যাসীদের । স্নান সেরে সন্ন্যাসীরা গণ্ডি কেটে মন্দিরে যাচ্ছে । কেউ কেউ দুহাতে , মাথায় ধুনোর মালসা নিয়ে মন্দির প্রদক্ষিণ করছে । এখানে – ওখানে নাচছে গাজনের সঙ । মাটির বিরাট কুমীর তৈরী করা হয়েছে , তার সারা গায়ে কাঁচা খেজুর বুটি । লোকের চিৎকার , ঢাকের বাজনা । সবার মুখেই উৎসবের ঝিকিমিকি ।

স্কুলের পাশের বিরাট মাঠে বসেছে চড়ক পূজার মেলা । মেলাও বেশ জম – জমাট । বেচাকেনার ধূম লেগেছে । ক্রেতা – বিক্রেতার ভিড় মেলায় । কোথাও বসেছে কাঁচের চুড়ি , খেলনা । কোথাও ধামা – কুলো – মাদুর – পাটি । একদিকে বঁটি , কাঁচি , ছুরি , হাঁড়ি , কড়াই , বালতি । তেলেভাজার গন্ধ । কোথাও জিলিপি ভাজা চলেছে । ছেলেমেয়েরা পরমানন্দে খাচ্ছে । দোকানে দোকানে ভিড় । দরাদরি । কথা কাটাকাটি । কিনছে আবার ফিরে ফিরে যাচ্ছে । নাগরদোলা ঘুরছে । কোথাও ম্যাজিক খেলা চলছে । গ্যাস বেলুন – উড়ছে । ভেঁপু বাজছে । আরও কত রকমের প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসম্ভার । নানা বয়সের মানুষের মেলা । সব মিলিয়ে এক বৈচিত্র্যময় পরিবেশ ।

Fair and Country Trip

ধীরে ধীরে রাত বাড়ে । চড়ক ডাঙার মাঠের ভিড় পাতলা হতে থাকে । যারা উৎসবের জোয়ারে এসেছিল , ভাঁটায় তারা যে যার ঘরে ফিরে গেল । দোকানীরা পসরা গুছিয়ে বাড়ির পথ ধরল । সন্ন্যাসীরা উদার অনন্ত আকাশের নিচে ঘুমে ঢুলছে । এখানে – ওখানে পড়ে থাকে শত শত মানুষের মিলন স্মৃতি । নাই বা থাকল তাদের আধুনিক জীবনের আনন্দ – উপকরণ – সামগ্রী । নাই বা থাকল শহর – উৎসবের রোশনাই , বিলাস – বাহুল্য । এই স্থানীয় উৎসবই তাদের বছরের পর বছর একত্রিত করে । এই উৎসবই তাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে আনে বৈচিত্র্যের জোয়ার ।

দেশভ্রমণ (অনুচ্ছেদ)

দেশভ্রমণ পথিক প্রাণ মানুষ পথে পথেই রচনা করে পথের পাঁচালী । পথ চলাই তার ধর্ম । তার স্বভাবের মধ্যেই আছে এর চিরকালের পাগলামি । রক্তে আছে ভ্রমণের নেশা । অজানার দুর্বার টানে সে ঘর ছাড়ে ।

দেশভ্রমণের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক গভীর ও অচ্ছেদ্য । শুধু পুঁথির মধ্যেই শিক্ষার বিষয় আবদ্ধ থাকে না । যথার্থ বিষয় ছড়িয়ে আছে প্রকৃতির বিচিত্র চিত্রশালে , অজ্ঞাত দেশ – দেশান্তরে , মহাবিশ্বের মুক্তাঙ্গনে । তাই পুঁথির বিদ্যার সঙ্গে চাই বাস্তবের রাখীবন্ধন । তখনই শিক্ষা হয়ে ওঠে উপলব্ধির সামগ্রী । শুধু বই পড়েই অতীতের ভাস্কর্য স্থাপত্যের বিস্ময়কর শিক্ষবৈভব উপলব্ধি করা যায় না ।

শুধু অন্যের বর্ণনা থেকে মরুভূমির তপ্ততা , গিরিমালার বিরাটত্ব , অন্তহীন সমুদ্রের বিশালতা অনুভব করা যায় না । দেশভ্রমণের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার জাদু স্পর্শেই ইতিহাস – ভূগোলের নীরস কথা – কাহিনী প্রাণময় হয়ে ওঠে । দেশভ্রমণ আমাদের জ্ঞানকে করে তোলে অর্থময় ও পরিপূর্ণ । শিক্ষার সঙ্গে তার নিকট সম্পর্ক । প্রতীচ্যেও দেশভ্রমণের সঙ্গে তার আত্মার সম্পর্ক । দেশভ্রমণ আজ শিক্ষাসূচীর এক অপরিহার্য অঙ্গ ।

দেশভ্রমণ আমাদের মনে এনে দেয় এক বিরাটত্বের অনুভূতি । পর্যটন এক দুর্নিবার নেশা । এই নেশা মানুষকে টেনে নিয়ে যায় প্রকৃতির অবারিত মুক্তাঙ্গনে । দেশভ্রমণে মানুষের অভিজ্ঞতা বাড়ে বাড়ে হৃদয়ের প্রসারতা । দেশভ্রমণ সঙ্কীর্ণতা দূর করে । স্বার্থপরতার অবসান ঘটায় ।

প্রীতির বন্ধনকে দৃঢ় করে । প্রাদেশিকতার প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলে । পরিব্রাজকের সান্নিধ্যে এসে অন্যরাও লাভ করে নতুন দৃষ্টিভঙ্গী । পায় নতুন চিন্তাচেতনার খোরাক । দেশভ্রমণে মানুষে মানুষে ব্যবধান ঘোচে । দেশ ও জাতি নতুন করে অনুভব করে সংহতিবোধ । উপলব্ধি করে সৌভ্রাতৃত্ববোধের প্রয়োজনীয়তা ।

চিত্তবিনোদনই এর উদ্দেশ্য নয় । এতে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্র বিস্তৃত হয় । প্রশমিত হয় রাজনৈতিক ও সামাজিক কোলাহল , সন্দেহ , বিদ্বেষের পরিবেশ । ব্যবসা – বাণিজ্য সংক্রান্ত জ্ঞানলাভও এর পরোক্ষ ফল । পর্যটন আজ বিদেশী মুদ্রা উপার্জনের প্রধান উপায় । দেশভ্রমণ বর্তমানে একটি ‘ শিল্প ’ , লাভজনক ‘ রপ্তানি শিল্প । সারা বিশ্বই আজ দেশভ্রমণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে । রাষ্ট্রসংঘও ১৯৬৭ সালকে ‘ আন্তর্জাতিক পর্যটন বর্ষা বলে ঘোষণা করেছে ।

সুবিশাল ভারতভূমিও ভ্রমণবিলাসীদের কাছে স্বর্গবিশেষ । এখানে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য যেমন আছে , তেমনি ঐতিহাসিক সম্পদও ছড়িয়ে আছে সর্বত্র । এখানে একদিকে তার সৌন্দর্য – শোভিত দেবতাত্মা হিমালয় , ভূস্বর্গ কাশ্মীর , তরঙ্গ – মন্ত্রিত মহাসিন্ধু , আতঙ্ক পাণ্ডুর মরুক্ষেত্র , তুষার – ধরল কাঞ্চনজঙ্ঘা , শৈল শহর দার্জিলিং – সিমলা – উটি , ভয়ঙ্কর সুন্দর সুন্দরবনের গহন অরণ্য , সমুদ্রোপকূলের শ্যামল শোভন নারিকেল বীথি , হরিদ্বার- কেদার – বন্দ্রী – পরেশনাথ – তিরুপতি , অন্যদিকে ভাষা – ধর্ম – রুচি – বৈচিত্র্য – বিলসিত জনপদ , অজন্তা – ইলোরা – তাজমহল – কোণারক – খাজুরাহো – নালন্দা – রাজগীর সারনাথ – লালকেল্লা- দিলওয়ারার মত ভাস্কর্য – স্থাপত্যের অনুপম শিল্প নিদর্শন ।

অতীত ইতিহাসের আরও কত ধূসর জগৎ । রয়েছে আরও কত পাহাড় পর্বত , কত অভয়ারণ্য , কত তীর্থভূমি , উৎসব মেলায় কত রকমের নৃত্যগীতের মহান ঐতিহ্য । আছে আরও নয়ননন্দিত মন্দির – মসজিদ । কত বিচিত্র পশুপাখি । বারবার ছুটে গিয়েও তৃপ্তি নেই । দেখে দেখেও দেখা ফুরোয় না ।

আজ বিশ্বজুড়েই দেশভ্রমণের জোয়ার এসেছে । দেশ – দেশান্তরের লক্ষ কোটি মানুষের রক্তে লেগেছে ভ্রমণের নেশা । তাদের কাছে অজানার হাতছানি । সুদূরের আহ্বান । ডাক এসেছে নিরুদ্দেশের পথে বেরিয়ে পড়ার । কবে এর শুরু হয়েছিল জানা নেই । কবে এর শেষ , তাও অজানা । ‘ হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে । সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে অনেক ঘুরেছি আমি । ‘ এর শেষ নেই , বিরাম নেই । অনন্ত যাত্রাপথে সে অক্লান্ত পথিক ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here