রক্তদান জীবনদান Donating Blood is Giving Life

0
77
Donating blood is giving life

রক্তদান জীবনদান Donating blood is giving life

রক্তদান মহৎ কাজ

“ সকলের তরে সকলে আমরা

প্রত্যেকে আমরা পরের তরে । ”

এই সমাজে আমরা কেউই একক কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে বাস করতে পারি না । প্রতি পদক্ষেপেই আমাদের প্রয়োজন হয় অন্যের সহযোগিতা । সেইজন্য আবহমান কাল থেকে সামাজিক অধিকার এবং কর্তব্যের জয়গাথা গীত হয়েছে মৈত্রী , সহযোগিতা , পরহিত অথবা মানবকল্যাণের মন্ত্র হয়েছে উচ্চারিত । এই আদর্শ , অর্থাৎ পারস্পরিক কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন শুধু কথার কথা মাত্র নয় , শুধু ভাবালুতা সর্বস্ব উক্তিমাত্রই নয় — সাম্প্রতিককালে তারই বাস্তব নিদর্শন হল — রক্তদান । সমাজে মানবহিত কিংবা জনসেবার যত দৃষ্টান্ত এ পর্যন্ত দেখা গেছে । তার মধ্যে রক্তদান অবশ্যই শীর্ষস্থানের দাবি করতে পারে ।

Donating blood is giving life

এক মানবশরীর থেকে আর এক মানবশরীরে রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন এবং পদ্ধতি বহু আগে থেকেই চিকিৎসা বিজ্ঞানে অনুভূত হয়েছিল । এ বিষয়ে ক্রমানুশলীল ও পরীক্ষা – নিরীক্ষার পরে চিকিৎসা – বিজ্ঞানীরা কয়েকটি স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন এবং তার প্রয়োগ – পদ্ধতিও আবিষ্কার করেছেন । সিদ্ধান্তগুলি হল :

প্রথমত , মানবদেহের রক্তই অপর মানবদেহের রক্তে সঞ্চালিত করা যেতে পারে , মানুষ ছাড়া অপর কোন প্রাণিদেহের রক্ত মানবদেহে সঞ্চালিত করা যেতে পারে , মানুষ ছাড়া অপর কোন প্রাণিদেহের রক্ত মানবদেহে সঞ্চালিত করা যেতে পারে , মানুষ ছাড়া অপর কোন প্রাণিদেহের রক্ত মানবদেহে সঞ্চালিত করে কোন ব্যক্তিকে নিরাময় করা যায় না , এবং তার ফল ভয়াবহ হতে পারে ।

দ্বিতীয়ত , নির্বিচারে এক মানুষের রক্তকে অপর মানুষের দেহে সঞ্চালিত করা চলে না । ভিয়েনার প্রখ্যাত চিকিৎসক ল্যাণ্ড স্টিনার ঘোষণা করেন যে , মানুষের রক্তকে চারটি গ্রুপে ফেলা যায় — A , B , AB এবং O গ্রুপ । চিকিৎসাধীন ব্যক্তির রক্ত যে গ্রুপের , কেবল সেই গ্রুপের সুস্থ মানবরক্তই তার শরীরে সঞ্চালিত করা প্রয়োজন । চিকিৎসাধীন ব্যক্তির রক্ত যে গ্রুপের , কেবল সেই গ্রুপের সুস্থ মানবরক্তই তার শরীরে সঞ্চালিত করা প্রয়োজন । ভিন্ন গ্রুপের রক্ত অবশ্যই নয় । প্রসঙ্গত রক্তদানের আগে Rh গ্রুপও দেখা হয় ।

এই কাজটি সুসম্পন্ন করতে হলে সুস্থ মানবকে রক্তদান করতে হয় । তাই একজনের রক্তদান করার অর্থ হল আর একজনের প্রাণ ফিরিয়ে আনা । চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা রক্তদানেরও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন । উপযুক্ত বয়সে কোন সুস্থ ব্যক্তির শরীর থেকে এক কালে ২৫০ সি . সি . রক্ত টেনে নিলে শরীরের কোন ক্ষতি হয় না । যেটুকু রক্তের ঘাটতি হয় , তাও সাধারণত সাতদিনের মধ্যে পূরণ হয়ে যায় । কিন্তু শুধু রক্ত দান করলেই হয় না , এই রক্তকে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থাও করা হয় । এই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে অথবা চিকিৎসাকেন্দ্রে রক্তদান শিবির প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ।

এই শিবিরগুলিতে সুস্থ মানুষ রক্তদান করেন আবার সেই রক্তকে সংরক্ষিতও করা হয় । এই উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট যে বোতল আছে , সেগুলি ৫০ সি . সি . অ্যাসিড সাইট্রেট ডেক্সট্রেজ সম্বলিত । প্রতি সুস্থ মানবদেহ থেকে ২৫০ সি . সি . রক্ত নিয়ে ওই বোতলে রাখা হয় । একেই বলা হয় এক বোতল রক্ত । রক্তের গ্রুপ ধরে প্রত্যেকটি বোতলকে এক এক শ্রেণীভুক্ত করা হয় এবং কতদিনের মধ্যে এই রক্ত ব্যবহার করতে হবে , বোতলের গায়ে তাও লিখে রাখা হয় । বোতলের রক্ত কতদিন অবিকৃত থাকবে — তা নির্ভর করে তাপমাত্রা ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিকতার উপর । ৪ ডিগ্রি থেকে ৬ সেন্টিগ্রেড তাপ সমন্বিত ফ্রিজে কমপক্ষে ১৯ দিন , আবার কারও কারও মতে তিন মাস পর্যন্ত রক্ত রাখা যায় ।

সমাজের মানুষ যাতে রক্তদানে অনুপ্রাণিত হন , তার জন্য সরকারী ব্যবস্থায় স্থানে স্থানে আলোচনা চক্র , স্নাইড প্রদর্শন ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হয় । তাছাড়া , রক্তদানকারীকে কিছু অর্থ প্রদানেরও ব্যবস্থা আছে । কিন্তু সমাজে যত আহত এবং পীড়িত ব্যক্তির যত পরিমাণ রক্ত প্রয়োজন , তার তুলনায় অর্থের বিনিময়ে রক্ত সংগ্রহের পরিমাণ নিতান্তই অল্প । সুতরাং , প্রত্যেক সমাজ – সচেতন ব্যক্তিকেই স্বেচ্ছায় রক্তদান অবশ্য কর্তব্য বলে উপলব্ধি করতে হবে । এই উদ্দেশ্য বহু সমাজকল্যাণকামী প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছা রক্তদান শিবির খোলেন এবং জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করে রক্ত সংগ্রহ করেন । সুখের বিষয় , আজ মহিলারাও এগিয়ে এসেছেন স্বেচ্ছায় রক্তদান করে এই মহৎ কর্মসূচীকে সাফল্যমণ্ডিত করতে ।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির বিশেষ নিদর্শন রক্ত সঞ্চালন বিজ্ঞান । বিজ্ঞানীরা সাড়ে তিনশ বছরের সাধনায় এই বিজ্ঞান সত্য নির্ণয় করেছেন । ভারতবর্ষে ব্লাড ব্যাঙ্ক প্রথম স্থাপিত হয় কলকাতা শহরে । এখন পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চাশটিরও বেশি ব্লাড ব্যাঙ্ক আছে । সরকারী ব্লাড ব্যাঙ্কে নিয়মিত রক্তদাতারা আসেন এবং রক্ত দান করেন । এই রক্তদাতাদের মধ্যে অনেকেই পেশাদারি । এছাড়া অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবামূলক প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে সহৃদয় মানুষরা আসেন ও রক্তদান করেন ।

সাম্প্রতিকালে রক্তদাতাদের সংখ্যা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে , বিশেষ করে মানবিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে রক্তদান করছেন অনেক মানুষ । যারা রক্ত দেন , বিশেষ করে যারা স্বেচ্ছারক্তদাতা , রক্তদান সম্পর্কে তাদের কিছু জিজ্ঞাস্য থাকে , সেই প্রশ্নগুলির উত্তর জানা দরকার । সাধারণভাবে ১৮ থেকে ৬০ বৎসর বয়স্ক যে কোন নারী – পুরুষ রক্ত দিতে পারেন । রক্তদাতার দেহের ওজন হতে হবে অন্তত ৪৫ কিলোগ্রাম ।

রক্তদানের পূর্বে রক্তদাতাকে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে দেখে সিদ্ধান্ত নেন দাতা রক্ত দেওয়ার উপযুক্ত কিনা । কয়েকটি বিষয়ে তাকে প্রশ্ন ও পরীক্ষা করা হয় । সেগুলো হল — বয়স , ওজন , বিভিন্ন রোগের বিচার : রক্তদাতার কখনো ম্যালেরিয়া , জণ্ডিস , যক্ষ্মা , বসন্ত , যৌনরোগ ইত্যাদি হয়েছিল কিনা , এবং হয়ে থাকলে কতদিন আগে তা হয়েছে , রক্তচাপ নির্ণয় এবং হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা । হৃৎপিণ্ড , ফুসফুস ও যকৃত সম্পর্কেও চিকিৎসককে অবহিত হতে হবে । রক্তদাতাদের আরও জানা দরকার যে রক্তদান করলে শরীরের কোন ক্ষতি হয় না , রক্তদানে কোন শারীরিক কষ্ট নেই , রক্তদান করলে রক্ত দু – তিন সপ্তাহের মধ্যে পূরণ হয়ে যায় । তিন মাস অন্তর রক্ত দিলেও দাতার কোন ক্ষতি হয় না ।

ক্ষুধার্তকে অন্নদান , তৃষ্ণার্তকে জলদান — আমরা ধর্ম বলে বিশ্বাস করি । মুমূর্ষকে প্রাণদান করাও তা হলে আরও অনেক বড় ধর্ম । তাছাড়া , সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে বিচার করলে বোঝা যায়— —যিনি আজ রক্তদান করেছেন , ভবিষ্যতে তাকেই হয়তো অপরের রক্ত নিতে হবে । এই অনন্য সাধারণ দানব্রত যে আজ বহু অকালমৃত্যুকে রোধ করেছে , বহু মৃত্যুপথযাত্রীকে নবপ্রাণরসে সঞ্জীবিত করেছে — সে বিষয়ে সন্দেহ নেই ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here