Disability issues প্রতিবন্ধী সমস্যা ও মানবিক কর্তব্য

0
54
Disability issues

Disability issues প্রতিবন্ধী সমস্যা ও মানবিক কর্তব্য(অনুচ্ছেদ)

“ অন্ধজনে দেহো আলো , মৃতজনে দেহো প্রাণ ” –রবীন্দ্রনাথ

ঋগ্বেদের ঋষি প্রার্থনা করেছিলেন , “ হে দেবগণ আমরা যেন কর্ণে শুনি মঙ্গলকর বাক্য , চোখে দেখি মঙ্গলকর দ্রব্য , অচঞ্চল , অঙ্গপ্রত্যঙ্গসহ দেহ নিয়ে যেন দেবদত্ত আয়ু ভোগ করতে পারি । ” উপনিষদের ঋষি বলেছেন , এই জগতে কর্ম করতে করতে শতবর্ষ বাঁচতে ইচ্ছা করবে ।

Disability issues

কিন্তু যারা দেখল না জগতের আলো , কিংবা বৈচিত্র্যময় এই সুন্দর পৃথিবীতে সংগীত ধ্বনি শোনার পূর্বেই যাদের বিনষ্ট হয়েছে শ্রবণশক্তি , অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অপূর্ণতা নিয়েই যারা জন্মাল অথবা পরবর্তীকালে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারিয়ে হয়ে গেল অক্ষম , পঙ্গু — তারা কিসের আকর্ষণে শতবর্ষ আয়ু ভোগ করার জন্য বেঁচে থাকতে চাইবে ? তারা যে সমাজের বোঝা — অবজ্ঞা , উপেক্ষা , অনুকম্পার পাত্র । সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের দয়া ভিক্ষা করে এদের বাঁচতে হয় ।

Also Read Student Society স্বাধীন ভারতে ছাত্রসমাজ

দৈহিক বা মানসিক দিক থেকে যারা স্বাভাবিক নয় — সকল ইন্দ্রিয় বা অঙ্গ যাদের সচল নয় , স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় যাদের দৈহিক বা মানসিক অক্ষমতা প্রতিবন্ধ বা বাধার সৃষ্টি করে , সাধারণভাবে তাদেরই বলা প্রতিবন্ধী । যারা অসম্পূর্ণ অঙ্গ নিয়ে পৃথিবীর মৃত্তিকা স্পর্শ করল , তার জন্য দায়ী তারা নিজেরা নয় , দায়ী মানবসমাজ । যারা দৈহিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে পৃথিবীর মৃত্তিকা স্পর্শ করল , তার জন্য দায়ী তাদের পিতামাতার কোন রোগ , নয়তো মাতার অপুষ্টি , নয়তো পরিবেশদূষণজনিত প্রতিক্রিয়া ।

তাই টনক নড়েছে বিশ্বের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন চিন্তানায়কদের । ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দকে প্রতিবন্ধী বর্ষ হিসাবে পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রসংঘ । উদ্দেশ্য , এদের সম্বন্ধে বিশ্ববাসীকে সচেতন করা এবং এদের সুস্থ মানসিকতায় প্রতিষ্ঠিত করে কর্মচঞ্চল জীবনধারার অখণ্ড স্রোতের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া । প্রতিবন্ধীদের আত্মপ্রতিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে উপযুক্ত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের উপর গুরুত্ব আরোপ করে পাঁচদফা নীতি গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রসংঘ । পৃথিবীর অনেক দেশই এ বিষয়ে তৎপর হয়ে বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছে এবং বিজ্ঞানবুদ্ধি ও আধুনিকতম প্রযুক্তিবিদ্যাকে এই সমস্যা সমাধানে প্রয়োগ করেছে ।

প্রতিবন্ধীদের মধ্যে সুপ্ত রয়েছে আশ্চর্য প্রাণশক্তি ও কর্মপ্রতিভা । সুযোগ পেলে যে এদের সুপ্তশক্তি জাগ্রত হয়ে উঠতে পারে , এরাও জীবনে সফল হতে পারে , তার প্রমাণ বিশ্ববিজয়নী হেলেন কেলার আর পশ্চিমবঙ্গে মূক – মুখে ভাষা – ফোটা সরকারী পুরস্কার প্রাপ্ত শিল্পী ঝুমা রায় । কখনও কখনও প্রতিবন্ধীদের ভিক্ষার অসম্মান বর্জন করে স্বনির্ভরতার সাধু সংকল্পে ফেরিওয়ালার জীবিকা গ্রহণ করতে দেখা যায় । এদের সংস্রচেষ্টাকে অবজ্ঞা ও উপহাস না করে উৎসাহিত করা প্রয়োজন । ব্রেল পদ্ধতির সাহায্যে অনেক দৃষ্টিহীনকে কৃতবিদ্য হতেও দেখা যায় ।

পশ্চিমবঙ্গে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে প্রতিবন্ধী কল্যাণমূলক নানা কর্মসূচী গৃহীত হয়েছে । সরকারী নিয়োগের দুই শতাংশ সংরক্ষণ নিয়োগ , কর্তৃপক্ষের নিকট অন্তত একজন প্রতিবন্ধী নিয়োগের নির্দেশ , এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে এদের জন্য পৃথক বিভাগ খোলা , প্রতি ব্লকে প্রতি বৎসর এদের একজনকে ডাক্তারি ও একজনকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগদান , কলকাতার পাতিপুকুরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা , প্রতি জেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রভৃতি প্রতিবন্ধীদের জীবনের নৈরাশ্য ও বৈকল্য দূরীকরণের উদ্দেশ্যে সরকার প্রকল্প নিয়েছে ।

নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন ব্লাইন্ড বয়েজ একাডেমি , কলকাতার ডেক্ এণ্ড ডাম্ব স্কুল , অলকেন্দু বোধ নিকেতন , বেহালার ব্লাইন্ড স্কুল , বোধিপীঠ , বালিগঞ্জে লাইট হাউস ফর দি ব্লাইন্ড , মাদার টেরেসার আশ্রম , হাওড়ায় রাঘবেন্দ্র ব্যানার্জী ইনস্টিটিউট ফর মেন্টালি রিটার্ডেড চিলড্রেন এন্ড স্টুডেন্টস সেন্টার প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার ব্যবস্থা করে তাদের স্বাভাবিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়াসী হয়েছে ।

প্রতিবন্ধীদের হাতের কাজ শেখানোর ব্যবস্থাও অনেক প্রতিষ্ঠানেই আছে । পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে প্রতিবন্ধীদের প্রতি সাবেক দিনের মনোভাব আছে । উপযুক্ত প্রচার ও শিক্ষার দ্বারা এর পরিবর্তন প্রয়োজন । প্রতিবন্ধী কেউই স্বেচ্ছায় হয় না , এর সঙ্গে পাপ ও পুণ্যের কোন সম্পর্ক নেই । গ্রামে প্রতিটি পঞ্চায়েত এবং জেলা বোর্ডের সেই স্থানের প্রতিবন্ধীদের সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী ও মানবিকভাবে সচেতন হওয়া দরকার ।

কিন্তু প্রতিবন্ধীদের সংখ্যার তুলনায় এই কল্যাণ প্রয়াস যথেষ্ট নয় । যে দেশে ডাক্তারি- ইঞ্জিনিয়ারসহ লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত – বেকার , সে দেশে প্রতিভাবান এবং উচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত হলেও সামগ্রিকভাবে প্রতিবন্ধীদের কর্মে নিযুক্তি দুরাশা মাত্র । সুতরাং , হাতের কাজ , চারু ও কারুশিল্প ইত্যাদিতে দক্ষতা অর্জনের দিকেই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন । বেকারের সংখ্যা না বাড়িয়ে প্রতিবন্ধীদের স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জনের ব্যবস্থা করতে পারলে তারা আত্মনির্ভরশীল হয়ে সুস্থভাবে জীবনযাপন করতে পারবে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here