Culture of Bengal বাংলার সংস্কৃতি 2030

0
47
Culture of Bengal

Culture of Bengal বাংলার সংস্কৃতি


বাংলার সংস্কৃতি প্রবন্ধ রচনা

বাংলার সংস্কৃতি বা বাঙালি সংস্কৃতি ধারণ করে আছে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের বাঙালিরা, যার মধ্যে বাংলাদেশ, যেখানে বাংলা একমাত্র জাতীয় ও রাষ্ট্রভাষা এবং ভারতের পশ্চিম বাংলা, ত্রিপুরা ও আসাম , যেখানে বাংলা ভাষা প্রধান এবং দাপ্তরিক। বাঙালিদের রয়েছে ৪ হাজার বছরের ইতিহাস।

Culture of Bengal

বাংলার সংস্কৃতি বাঙালির জাতীয় চরিত্রের মধ্যে সংগুপ্ত এক প্রাণশক্তি আছে । সে শক্তি হচ্ছে তার সংস্কৃতির চেতনা । এই সংস্কৃতি তার প্রাণের সৃষ্টি । একদিকে বাহিরের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ঝড় – তুফানের হাত থেকে এই সংস্কৃতি তাকে রক্ষা করেছে , কোন দুর্ভিক্ষ – দাঙ্গা মন্বন্তর বা রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় তাকে ধ্বংস করতে পারেনি , তেমনি এক অবিনাশী প্রাণসত্তায় সে সকল কিছুর উপরে মাথা তুলেছে — সব অবস্থার উপরে প্রতিষ্ঠিত করেছে নিজেকে । বাঙালি সংস্কৃতিই হচ্ছে সেই অপারজেয়র মন্ত্র ।

ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলা ছিল তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে ধনী অঞ্চল।বাংলা অঞ্চল ছিল তৎকালীন সময়ের উপমহাদেশীয় রাজনীতির এবং সংস্কৃতির রাজধানী। ১৯৪৭ এর দেশভাগের পর বাংলার সংস্কৃতি ক্ষয় হতে থাকে। বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত হওয়ায় সেখানের সংস্কৃতি মূলত বাঙালি মুসলিমরাই ধারণ করে রাখে। মুসলমান অধ্যুষিত বাংলাদেশে হিন্দুরা সংখ্যায় নগন্য আর হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিবঙ্গে মুসলমানরা নগন্য। এছাড়াও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীও রয়েছে। বাংলা মুসলিম ও হিন্দু প্রধান হওয়ায় এখানকার সংস্কৃতি মূলত এই দুই ধর্মাবলম্বীদের হাতেই যৌথভাবে গড়ে উঠেছে।

বাঙালি সংস্কৃতি বললে আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে এক মিশ্র সংস্কৃতির কথা । এই সংস্কৃতির রূপটি খুঁজতে গেলে যেতে হবে তার ক্রমবিকাশের ধারাটিতে । বাংলার মৃত্তিকায় যেমন অনেক অনেক বছরের পলিস্তর এসে মিলেছে , তেমনি বাঙালি জাত সৃষ্টির মূলেও রয়েছে নানা জাতি ও গোষ্ঠীর দান । বাঙালি এক মিশ্র জাতি । নৃতত্ত্বের গবেষণার আলোকে তা ধরা পড়েছে । এই জাতির প্রাথমিক সূচনার ক্ষণে বাঙালির সংস্কৃতি পুষ্ট হয়েছে একদিকে অষ্ট্রিক – দ্রাবিড় প্রভৃতির দানে , অন্যদিকে প্রয়োজনে আর্যসভ্যতার কাছ থেকেও সে প্রচুর গ্রহণ করেছে । মোটামুটিভাবে প্রাথমিক এই চেহারা ।

পরবর্তীকালে , ইতিহাস যাকে মধ্যযুগ বলে চিহ্নিত করেছে , সেই পর্বে বাঙালির জীবনে ক্রিয়াশীল হয়েছে অন্যতর প্রভাব । এই পর্বে যেমন এসেছে মুসলিম সংস্কৃতির প্রবাহ , তেমনি ইউরোপীয় প্রাণপ্রবাহও বাঙালি একদিকে রাজা ও রাজসভার প্রত্যক্ষ শাসনের ফলে পুষ্ট সংস্কৃতি , অন্যদিকে লোকজীবনের বিশিষ্ট ধারায় সৃষ্ট গ্রামীণ সংস্কৃতি । প্রথমটিকে যদি বলা হয় , অভিজাত সংস্কৃতি , দ্বিতীয়টিকে বলা যায় লোকসংস্কৃতি । নানা রাজশক্তির উত্থান – পতনের মধ্য দিয়ে মধ্যযুগের বঙ্গসংস্কৃতি নিজেকে রক্ষা করে এসেছে বিপুল শক্তিতে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত । সাম্রাজ্যের ভাঙাগড়া উত্থান – পতন তার সংস্কৃতি – পুষ্ট সমাজটিকে নষ্ট করতে পারেনি ।

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে দেশীয় নবাব শক্তির পতন ও এদেশে ইংরাজ রাজশক্তির প্রতিষ্ঠা । এই সময় থেকে পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষা ও ভাবধারার সঙ্গে ক্রমশ সংযোগের সূচনা ঘটে । রামমোহন – বিদ্যাসাগর – অক্ষয়কুমার- ভূদেব – মধুসূদন – বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথের বাঙালি সংস্কৃতি আজ পাশ্চাত্য প্রভাবের অনেকখানি যেমন গ্রহণ করেছে , তেমনি ভেতরে ভেতরে তার গ্রামীণ লোক – সংস্কৃতির ধারাটিও একেবারে লুপ্ত হয়ে যায় নি ।

সংস্কৃতিকে কেউ কেউ ‘ মিষ্টতা ’ বলার পক্ষপাতী । ইংরেজিতে ‘ Culture is sweetness ” । বাস্তবিকপক্ষে বাঙালি সংস্কৃতির এই মিষ্টত্ব ফুটে উঠেছে তার চাল – চলনে , আচার – ব্যবহারে , পোশাকে – পরিচ্ছদে , তার আহারে – বিহারে , তার রুচি ও মননে , শিল্পে – সাহিত্যে , চিত্রকলায় , নৃত্যচর্চায় সকল দিকে ।

বাঙালির আটচালা বানাবার পদ্ধতি , বাঁশ ও বেত দিয়ে বাংলা শ্রেণীর ঘর , বাঙালির ঢোলক বাজানো , গাছের কাণ্ড কুঁদে নৌকা বানানো , বাঙালির কীর্তন , ঢপগান , নিজস্ব অলঙ্কার , বানাবার পদ্ধতি , চাল ও চিঁড়ের সাহায্যে নানা খাবার বানানো , বাঁশের বাঁশিতে সুর তোলা , বাঙালির চণ্ডীমণ্ডপ , নহবৎ , তুলসীতলায় সাঁঝের প্রদীপ দেখানো , বাঙালি নারীর শাড়ি পরা , বাঁশ ও বেতের নানা কাজ , বাঙালির ভাটিয়ালী বাউল ও মুর্শিদা গান , বাংলার শাঁখার ও শঙ্খের কাজ , নিজস্ব রেশমশিল্প , নানা প্রকার চাল ও ধানের বিশেষ বিশেষ নামকরণ — এইসব প্রতিটি জিনিসেই বাঙালি সংস্কৃতির প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় ।

সর্বভারতীয় সংস্কৃতির জগতে বাঙালির সংস্কৃতির একটি স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত রূপ আছে । নদীমাতৃক বাংলা তার সন্তানকে দিয়েছে শিল্প সাহিত্যে ঝোঁক , সঙ্গীত তার প্রতিভার একটি মাধ্যম , চারুকলা ও কারুকলায় তার অধিকার । রবীন্দ্রনাথ তার শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধর সন্তান । কিন্তু তাঁর পাশাপাশি গগনেন্দ্রনাথ , অবনীন্দ্রনাথ , নন্দলাল বসু , যামিনী রায় , উদয়শঙ্কর থেকে শুরু করে সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত কত নাম ঃ অতীতে এখান থেকেই সারা পৃথিবীতে কত মানুষ ছড়িয়ে পড়েছে — শীলভদ্র – দীপঙ্কর থেকে শুরু করে আধুনিক রবিশঙ্কর পর্যন্ত তার জয় – জয়কার । বাঁকুড়া – বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত শিল্প , কৃষ্ণনগরের মূর্তিগুলিও আজ জগৎ জয় করে চলেছে ।

বাঙালি সংস্কৃতির মূল স্রোতধারায় মিশে আছে বহু ধারা । যুদ্ধ , মহামারী , রাষ্ট্রবিপ্লব , বিজাতীয়ভাবের প্রভাবে বাঙালি জাতি বহুবার পর্যুদস্ত হয়েছে । কিন্তু তার সংস্কৃতির মৌল , শাশ্বত অন্তঃসলিলা স্রোতধারার মত নিত্যবহমান । বাঙালির সংস্কৃতির গৌরবময় রূপটি নানাভাবে প্রকাশিত — ‘ সেই ট্র্যাডিশন আজও সমানে চলেছে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here